আমাদের সৌরজগত ও সৌরজগতের ৮টি গ্রহ

চিত্র: সূর্যকে কেন্দ্র করে সৌরজগতের
৮টি গ্রহ নিজ নিজ কক্ষপথে আবর্তন করছে।

চিত্র: সূর্যকে কেন্দ্র করে সৌরজগতের ৮টি গ্রহ নিজ নিজ কক্ষপথে আবর্তন করছে।
মহাবিশ্বে অসংখ্য গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহ এবং অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর মধ্যে আমাদের সৌরজগত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা। এই সৌরজগতের কেন্দ্রবিন্দু হলো সূর্য, যা একটি মাঝারি আকারের নক্ষত্র। সূর্যকে কেন্দ্র করে আটটি গ্রহ, তাদের উপগ্রহ, বামন গ্রহ, গ্রহাণু, ধূমকেতু এবং অসংখ্য ছোট মহাজাগতিক বস্তু নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরছে। পৃথিবী এই সৌরজগতের তৃতীয় গ্রহ এবং বর্তমানে জানা তথ্য অনুযায়ী একমাত্র গ্রহ যেখানে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণার অগ্রগতির ফলে সৌরজগত সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। তাই সৌরজগত সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা শিক্ষার্থী, গবেষক এবং সাধারণ পাঠক—সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
সৌরজগত কেবল আটটি গ্রহের সমষ্টি নয়; এটি একটি সুসংগঠিত মহাজাগতিক পরিবার। সূর্যের শক্তিশালী মহাকর্ষ বলের কারণে প্রতিটি গ্রহ নিজ নিজ নির্দিষ্ট কক্ষপথে আবর্তিত হয় এবং একে অপরের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখে। সূর্য থেকে নির্গত আলো ও তাপ পৃথিবীতে জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য। একই সঙ্গে সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলো বিজ্ঞানীদের কাছে মহাবিশ্বের উৎপত্তি, গ্রহের বিবর্তন এবং পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানার সুযোগ করে দেয়।
সৌরজগতের উৎপত্তি
বিজ্ঞানীদের মতে প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে বিশাল একটি গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘ, যাকে সৌর নীহারিকা (Solar Nebula) বলা হয়, সেখান থেকেই সৌরজগতের সৃষ্টি হয়। মহাকর্ষীয় আকর্ষণের ফলে এই গ্যাসমেঘ ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। সংকোচনের ফলে কেন্দ্রস্থলে তাপমাত্রা ও চাপ এত বেশি বৃদ্ধি পায় যে সেখানে নিউক্লিয়ার ফিউশন শুরু হয় এবং সূর্যের জন্ম হয়। সূর্যের চারপাশে অবশিষ্ট গ্যাস ও ধূলিকণা একত্রিত হয়ে ধীরে ধীরে ছোট ছোট পিণ্ড তৈরি করে। কোটি কোটি বছরের সংঘর্ষ ও সংযোজনের মাধ্যমে সেই পিণ্ডগুলো থেকে গ্রহ, উপগ্রহ, গ্রহাণু এবং ধূমকেতুর সৃষ্টি হয়। এই ব্যাখ্যাকে নেবুলার তত্ত্ব (Nebular Hypothesis) বলা হয় এবং আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে এটিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব।
সৌরজগতের বয়স বর্তমানে প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর বলে ধারণা করা হয়। এই দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন গ্রহের গঠন, বায়ুমণ্ডল এবং পৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্যে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। পৃথিবীতে জীবন বিকশিত হলেও অন্য গ্রহগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে বিবর্তিত হয়েছে। তাই প্রতিটি গ্রহের বৈশিষ্ট্য একে অপরের থেকে আলাদা এবং স্বতন্ত্র।
সৌরজগতের প্রধান উপাদান
সৌরজগতের সবচেয়ে বড় উপাদান হলো সূর্য, যা পুরো সৌরজগতের মোট ভরের প্রায় ৯৯.৮৬ শতাংশ ধারণ করে। সূর্যের বাইরে রয়েছে আটটি স্বীকৃত গ্রহ, দুই শতাধিক পরিচিত প্রাকৃতিক উপগ্রহ, লক্ষ লক্ষ গ্রহাণু, অসংখ্য ধূমকেতু, বামন গ্রহ এবং মহাকাশে ছড়িয়ে থাকা ধূলিকণা। মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝখানে অবস্থিত গ্রহাণুপুঞ্জ (Asteroid Belt) সৌরজগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এছাড়া নেপচুনের বাইরেও রয়েছে কুইপার বেল্ট, যেখানে প্লুটোসহ বহু বামন গ্রহ অবস্থান করছে।
চিত্র: সূর্য সৌরজগতের কেন্দ্র এবং
সকল গ্রহের প্রধান শক্তির উৎস।
সৌরজগতের ৮টি গ্রহ
বর্তমানে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংঘ (IAU)-এর স্বীকৃতি অনুযায়ী সৌরজগতের গ্রহের সংখ্যা আটটি। সূর্য থেকে ক্রমানুসারে গ্রহগুলো হলো—বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন। ২০০৬ সালের আগে প্লুটোকে নবম গ্রহ হিসেবে গণ্য করা হলেও পরে এটিকে বামন গ্রহ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। ফলে বর্তমানে সৌরজগতের স্বীকৃত গ্রহের সংখ্যা আটটি।
বিজ্ঞানীরা এই আটটি গ্রহকে দুটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। প্রথম চারটি গ্রহ—বুধ, শুক্র, পৃথিবী ও মঙ্গল—স্থলীয় বা পাথুরে গ্রহ। এদের পৃষ্ঠ কঠিন এবং শিলা ও ধাতু দিয়ে গঠিত। অন্যদিকে বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন হলো গ্যাসীয় ও বরফীয় দৈত্য গ্রহ। এদের অধিকাংশ অংশ গ্যাস, বরফ এবং বিভিন্ন উদ্বায়ী পদার্থ দিয়ে তৈরি। এই চারটি গ্রহ আকারে অনেক বড় এবং এদের অধিকাংশেরই অসংখ্য উপগ্রহ ও বলয় রয়েছে।