নবুয়ত লাভ ও ইসলামের সূচনা

নবুয়ত লাভ ও ইসলামের সূচনা

ভূমিকা

মানবজাতির ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যা কেবল একটি জাতি বা অঞ্চলের নয়, বরং সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুয়ত লাভ এবং ইসলামের সূচনা তেমনই একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। সপ্তম শতাব্দীর আরব সমাজ ছিল ধর্মীয় বিভ্রান্তি, সামাজিক বৈষম্য, নৈতিক অবক্ষয় এবং গোত্রীয় সংঘাতে জর্জরিত। এমন এক সময়ে আল্লাহ তাআলা মানবজাতির জন্য সর্বশেষ রাসূল হিসেবে মুহাম্মদ (সা.)-কে মনোনীত করেন এবং তাঁর মাধ্যমে ইসলাম নামক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার সূচনা করেন।




নবুয়তের মাধ্যমে মানুষের সামনে উন্মুক্ত হয় তাওহীদের আহ্বান, ন্যায়বিচার, মানবিক মূল্যবোধ, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব এবং আল্লাহর একত্ববাদের শিক্ষা। ইসলামের সূচনা কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন বা সামাজিক সংস্কার কর্মসূচি হিসেবে নয়; বরং এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ একটি ঐশী দিকনির্দেশনা, যার লক্ষ্য ছিল মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসা।

 

ইসলামপূর্ব আরব সমাজের অবস্থা

নবুয়তের গুরুত্ব বোঝার জন্য ইসলামপূর্ব আরব সমাজের চিত্র জানা জরুরি।

ধর্মীয় অবস্থা

মক্কার কাবাঘর মূলত হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর প্রতিষ্ঠিত তাওহীদের কেন্দ্র হলেও সময়ের প্রবাহে সেখানে প্রায় ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হয়। মানুষ আল্লাহর পরিবর্তে বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করত। কুসংস্কার, ভাগ্য গণনা এবং বিভিন্ন পৌত্তলিক প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল।

সামাজিক অবস্থা

নারীদের প্রতি বৈষম্য ছিল চরম। অনেক গোত্রে কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নির্মম প্রথাও বিদ্যমান ছিল। দাসপ্রথা ছিল স্বাভাবিক সামাজিক ব্যবস্থা। ধনী-গরিবের মধ্যে বৈষম্য ছিল প্রকট।

নৈতিক অবস্থা

মদ্যপান, জুয়া, সুদ, ব্যভিচার, প্রতিশোধমূলক যুদ্ধ এবং গোত্রীয় অহংকার সমাজকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। এই সময়কে ইসলামী ইতিহাসে "জাহেলিয়াতের যুগ" বলা হয়।

 

মহানবী (সা.)-এর নির্জন সাধনা

মহানবী (সা.) শৈশব থেকেই সত্যবাদী, বিশ্বস্ত ও নৈতিক চরিত্রের জন্য পরিচিত ছিলেন। সমাজের অন্যায়, মূর্তিপূজা ও নৈতিক অবক্ষয় তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করত।

চল্লিশ বছর বয়সে তিনি প্রায়ই মক্কার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত জাবালে নূরের হেরা গুহায় নির্জনে অবস্থান করতেন। সেখানে তিনি ধ্যান, চিন্তাভাবনা এবং আল্লাহর স্মরণে সময় কাটাতেন। তিনি সত্যের সন্ধান করতেন এবং মানবজাতির মুক্তির পথ নিয়ে ভাবতেন।

এই নির্জন সাধনাই ছিল নবুয়ত লাভের পূর্বপ্রস্তুতি।

 

হেরা গুহায় প্রথম ওহি

৬১০ খ্রিস্টাব্দে রমজান মাসের এক রাতে, যা পরবর্তীকালে লাইলাতুল কদর হিসেবে পরিচিত হয়, মহানবী (সা.) হেরা গুহায় অবস্থান করছিলেন।

এ সময় আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) তাঁর কাছে আগমন করেন এবং বলেন—

"ইকরা" (পড়ুন)।

মহানবী (সা.) উত্তর দেন—

"আমি পড়তে জানি না।"

জিবরাইল (আ.) তাঁকে তিনবার আলিঙ্গন করে পুনরায় একই নির্দেশ দেন। এরপর তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রথম ওহির আয়াতসমূহ পাঠ করেন—

"পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে জমাট রক্ত থেকে সৃষ্টি করেছেন। পড়ুন, আর আপনার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত। তিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে এমন বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না।"
(সূরা আল-আলাক, আয়াত ১–৫)

এই পাঁচটি আয়াতই ছিল কুরআনের প্রথম অবতীর্ণ আয়াত এবং এখান থেকেই ইসলামের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।

নবুয়ত লাভের পর মহানবী (সা.)-এর অনুভূতি

হেরা গুহার ঘটনায় মহানবী (সা.) গভীরভাবে বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি দ্রুত বাড়িতে ফিরে এসে তাঁর স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.)-কে বলেন—

"আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও।"

খাদিজা (রা.) তাঁকে শান্ত করেন এবং বলেন—

"আল্লাহ কখনো আপনাকে অপমান করবেন না। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অসহায়দের সাহায্য করেন, সত্য কথা বলেন এবং অতিথিদের সম্মান করেন।"

এই কথাগুলো মহানবী (সা.)-কে মানসিক শক্তি প্রদান করে।

 

ওয়ারাকা ইবন নওফলের সাক্ষ্য

হযরত খাদিজা (রা.) মহানবী (সা.)-কে তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবন নওফলের কাছে নিয়ে যান। তিনি পূর্ববর্তী আসমানি কিতাব সম্পর্কে জ্ঞানী ছিলেন।

ঘটনা শুনে তিনি বলেন—

"যে ফেরেশতা মূসা (আ.)-এর কাছে এসেছিলেন, তিনিই আপনার কাছেও এসেছেন। আপনি আল্লাহর রাসূল। আপনার জাতি একদিন আপনাকে বিরোধিতা করবে এবং মক্কা থেকে বের করে দেবে।"

পরবর্তীতে তাঁর এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হয়।

 

ওহি অবতরণের সাময়িক বিরতি

প্রথম ওহির পর কিছু সময় ওহি অবতরণ বন্ধ থাকে। এই সময় মহানবী (সা.) গভীরভাবে অপেক্ষা করতেন।

পরে সূরা আল-মুদ্দাসসিরের আয়াত অবতীর্ণ হয়—

"হে চাদরাবৃত! উঠুন এবং সতর্ক করুন। আপনার প্রতিপালকের মহিমা ঘোষণা করুন।"

এর মাধ্যমে মহানবী (সা.)-কে আনুষ্ঠানিকভাবে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়।

 

ইসলামের গোপন দাওয়াত

নবুয়তের পর প্রথম তিন বছর ইসলামের দাওয়াত গোপনে পরিচালিত হয়। কারণ সে সময় প্রকাশ্যে দাওয়াত দিলে মুসলমানদের ওপর চরম নির্যাতনের আশঙ্কা ছিল।

এই সময় মহানবী (সা.) নিকট আত্মীয়, বন্ধু এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানান।

 

সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারীরা

ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মুসলমানদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

হযরত খাদিজা (রা.) — প্রথম মুসলমান।

হযরত আলী ইবন আবি তালিব (রা.) — প্রথম কিশোর মুসলমান।

হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) — প্রথম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মুসলমান।

হযরত যায়েদ ইবন হারিসা (রা.) — প্রথম মুক্ত দাস মুসলমান।

হযরত আবু বকর (রা.)-এর দাওয়াতে পরবর্তীতে হযরত উসমান (রা.), হযরত যুবাইর (রা.), হযরত তালহা (রা.), হযরত আবদুর রহমান ইবন আউফ (রা.) প্রমুখ ইসলাম গ্রহণ করেন।

 

দারুল আরকাম

মক্কার নির্যাতনের পরিবেশে মুসলমানরা গোপনে শিক্ষা ও ইবাদতের জন্য আরকাম ইবন আবিল আরকামের বাড়িতে সমবেত হতেন।

এই স্থানটি ইসলামের প্রথম শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে কুরআন শিক্ষা, ঈমানের প্রশিক্ষণ এবং ইসলামী আদর্শ গঠনের কাজ পরিচালিত হতো।

 

প্রকাশ্য দাওয়াতের সূচনা

তিন বছর পর আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দেন—

"আপনার নিকট আত্মীয়দের সতর্ক করুন।"

এরপর মহানবী (সা.) সাফা পাহাড়ে উঠে কুরাইশদের সমবেত করেন।

তিনি প্রশ্ন করেন—

"আমি যদি বলি এই পাহাড়ের পেছনে একটি সেনাবাহিনী রয়েছে, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে?"

সবাই উত্তর দেয়—

"হ্যাঁ, কারণ আমরা কখনো আপনাকে মিথ্যা বলতে শুনিনি।"

এরপর তিনি আল্লাহর একত্ববাদ ও পরকালের বার্তা প্রচার করেন।

 

কুরাইশদের বিরোধিতা

ইসলামের শিক্ষা কুরাইশদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে চলে যায়।

তারা বিভিন্নভাবে বিরোধিতা শুরু করে—

উপহাস ও অপমান

সামাজিক বয়কট

শারীরিক নির্যাতন

অর্থনৈতিক চাপ

মিথ্যা প্রচারণা

 

প্রাথমিক মুসলমানদের ওপর নির্যাতন

ইসলাম গ্রহণের কারণে বহু সাহাবি কঠোর নির্যাতনের শিকার হন।

হযরত বিলাল (রা.)-কে উত্তপ্ত মরুভূমিতে শুইয়ে বুকে পাথর চাপিয়ে নির্যাতন করা হতো। তবুও তিনি বলতেন—

"আহাদ, আহাদ"
(আল্লাহ এক, আল্লাহ এক।)

হযরত ইয়াসির (রা.) ও সুমাইয়া (রা.)-কে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। সুমাইয়া (রা.) ইসলামের প্রথম শহীদ হওয়ার মর্যাদা লাভ করেন।

 

ইসলামের মৌলিক আহ্বান

প্রথম যুগের ইসলামের মূল বার্তা ছিল—

আল্লাহ এক এবং তাঁর কোনো শরিক নেই।

মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করতে হবে।

মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার করতে হবে।

এতিম, অসহায় ও দরিদ্রের অধিকার রক্ষা করতে হবে।

পরকালের জবাবদিহিতায় বিশ্বাস রাখতে হবে।

সৎ চরিত্র গঠন করতে হবে।

এই শিক্ষা আরব সমাজে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করে।

 

ইসলামের বিস্তারের ভিত্তি

প্রথমদিকে মুসলমানের সংখ্যা কম হলেও ইসলামের ভিত্তি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।

এর প্রধান কারণ—

মহানবী (সা.)-এর সততা ও বিশ্বস্ততা।

কুরআনের অলৌকিক ভাষা ও শিক্ষা।

সাহাবিদের আত্মত্যাগ।

ইসলামের সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ।

আল্লাহর সাহায্য ও ওহির ধারাবাহিকতা।

 

নবুয়ত লাভের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

মহানবী (সা.)-এর নবুয়ত লাভ কেবল একটি ধর্মীয় ঘটনা নয়; এটি মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়।

এর মাধ্যমে—

তাওহীদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়।

মানবাধিকারের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়।

নারী-পুরুষের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

দাসমুক্তির আন্দোলন শক্তিশালী হয়।

জ্ঞান অর্জনকে ইবাদতের মর্যাদা দেওয়া হয়।

একটি নৈতিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত হয়।

ইসলামের সূচনা পরবর্তীকালে আরব উপদ্বীপ অতিক্রম করে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বসভ্যতার রাজনীতি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও আইনব্যবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলে।

 

উপসংহার

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুয়ত লাভ মানবজাতির ইতিহাসে আলোর এক নতুন সূচনা। হেরা গুহায় অবতীর্ণ প্রথম ওহির মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান, সত্য, ন্যায়, সাম্য এবং আল্লাহর একত্ববাদের পথে আহ্বান পায়। ইসলামের প্রাথমিক যুগ ছিল আত্মত্যাগ, ধৈর্য, ঈমান এবং সংগ্রামের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সীমাহীন নির্যাতন ও প্রতিকূলতার মধ্যেও মহানবী (সা.) এবং তাঁর সাহাবিগণ ইসলামের বার্তা প্রচার অব্যাহত রাখেন। তাঁদের সেই ত্যাগ ও আদর্শের ফলেই ইসলাম আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্ম এবং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

বর্তমান যুগেও নবুয়ত লাভের এই ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়—সত্যের পথে অবিচল থাকা, জ্ঞান অর্জনকে গুরুত্ব দেওয়া, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ করাই ইসলামের প্রকৃত চেতনা। তাই নবুয়ত লাভ ও ইসলামের সূচনার ইতিহাস কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; এটি মানবতার জন্য চিরন্তন প্রেরণার উৎস।

 

 

 

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন